-“তুই কতটা বেআক্কেলে আমি শুধু ভাবছি সেটা, তুই ওটা ওকে গিয়ে বলে দিলি? কেউ বলে এটা?”

নীলিমাদেবী ছেলে আকাশের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে রান্নাঘরে চলে গেলেন। আজ মর্নিং ডিউটি নেই, দুপুরে খেয়েদেয়ে বেরবেন, তাই হাতে সময় আছে বেশ খানিক্ষন, পোস্তটা সবে নামাতে যাচ্ছিলেন তখনই আকাশ বলল কথাটা, “তাতে কী হয়েছে মা, ও তো বারবার জানতে চাইছে, আমি আর কী বলতাম, তাই সত্যিটাই বললাম। তারপরই ও বললো তোমার সাথে একটু দেখা করতে চায়, এবার কী বলব তখন? আর একটু পরেই ও এসে যাবে, তারপর যা বলার বলে দাও, তাহলেই হয়।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই উচ্ছল, দস্যি মেয়েটা হাজির। ছটপটে, খুব কথা বলে, নীলিমাদেবী বড় একটা কথা বলেন না। পিউ প্রথম দিন এসেই প্রণাম করে এত কথা, যেন কতদিনের চেনাপরিচিতি। নীলিমাদেবীর বানিয়ে দেওয়া লুচি, আলু ছেঁচকি খেতে খেতে ওর তৃপ্ত মুখটা দেখে নীলিমাদেবীর কঠিন মুখোশের আড়ালে ঠোঁটটায় যেন হাসিটা এসেই যাচ্ছিল। এত ছেলেমানুষ? হ্যাঁ, পিউকে দেখে কেউ বলবে না ও আর আকাশ সমবয়সী। আসলে আকাশের থেকে বরং বড় খানিক। নীলিমাদেবীর সাথে দেখা করতে চলে এসেছে সটান, সব শুনে।

কে বুঝবে ওনারই ছেলে বোকার মত সবকিছু বলে বসবে পিউকে? আর এত বয়স হলো, এই বুদ্ধি নিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছিস?

আলু চচ্চড়ির বাটিটা চেটেপুটে পরিষ্কার করে নীলিমাদেবীর দিকে চোখে চোখ রেখেই পিউ বলল, “কাকীমা, আমি অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি বলে আপনার আমায় বাড়ির বৌ হিসাবে মানাতে এত আপত্তি? কিন্তু আমার তো এতে কোন হাত নেই কাকীমা, আপনি রোজ যেভাবে সন্তানদের নিজের হাতে করে তাদের মায়ের হাতে তুলে দেন, আমিও ওরকমই একটা বাচ্চা ছিলাম, শুধু আমায় কেউ তার জীবনে উপস্থিত করতে চায়নি, এতে তো আমার কোন দোষ নেই । তাহলে তার শাস্তি আমায় কেন দিতে চাইছেন আপনি? এটা আমি আপনার থেকেই জানতে চাই?”

একটা কর্কশ কাকের আওয়াজ নীলিমাদেবীর আর পিউ-এর কথোপকথন-এর পরের নৈশব্দটা ভাঙল।

-“বাড়ির বৌ, বংশ পরম্পরায় চলে আসা এতদিনের আচার নিয়ম-কানুন কীভাবে করবে? বিয়েতে সম্প্রদান হবে কী ভাবে? তোমার মা বাবা গোত্র…”

-“কাকীমা, আপনার কাছে আমার খুশী, ভাল থাকাটা জরুরী নাই হতে পারে। কিন্তু আপনার ছেলে যে ভাল থাকবে না এটা আপনি বুঝবেন ভেবেছিলাম। মানুষের তৈরী এই আচার নিয়ম আপনার কাছে যদি বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে আর আমি বেশী কিছু বলব না। সত্যি কথা বললে আমার শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সেটার সাথে আমার অজ্ঞাত জন্মপরিচয়টা আবার কানেক্ট হয়ে যাবে কারণে, অকারণে, জানি আমি। আমি আজ আসি, ও হ্যাঁ, লুচি তরকারিটা দারুন ছিল কাকিমা, এত যত্ন করে কেউ খাওয়ায়নি কোনদিন। আসছি।।।”

রান্নাঘরে মালতী বাসন ফেললো বোধহয়, কয়েকবছর আগের ঐ স্মৃতিগুলো আবার এলোমেলো হয়ে হারিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে।

।।২।।

রুহি কথাগুলো বলে কিছুক্ষন চুপ রইল, ওর চোখমুখ দেখে এটুকু পরিষ্কার ওর ভিতর কী ঝড় চলছে, গলার কাছে আর্তনাদটাকে যথাসম্ভব চাপা দিয়ে কথাগুলো বলল রুহি। ওর আঁধার মুখ চোখে যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট।

-“তুমি জানো আদৌ তুমি কী বলছ? এত বড় ডিসিশন ওভার নাইট নিয়ে নিলে? এই জন্যই বলি, ছেলেমানুষ এরা, অল্প বয়সে… যাই হোক, তুমি আগে মাথা ঠান্ডা করো, তারপর ডিসিশন নাও, এখনও তো আরেকটাদিন আছে।”

টেবিলের উপর রাখা পেপার-ওয়েটটা ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন নীলিমাদেবী। পরনে ঘিয়ে রঙের শাড়ি, চোখের রিমলেস চশমার কাঁচ গলে অভিজ্ঞ চোখ বারবার জরিপ করছিল মেয়েটার মুখ, চালচলন। বাঁ হাতে হাত ঘড়ি, ডান হাতে বালা, গলার হার, কানে মুক্ত, সাধারণ খোঁপায়, চেহারায়, গাম্ভীর্যে যেন সবসময় কর্ত্রী। পেশায় ডাক্তার হলেও দেখে বেশী মনে হয় কোন সম্ভ্রান্ত বাড়ির সদস্য। আদপেও তাই। তাই ডাক্তারি পেশা হলেও নীলিমাদেবীর মেজাজ, চাল চলন, আচার আচরণ অনেকটাই উল্টো দিকের মানুষটার ভীতির কারণ, এতটাই রাশভারী, বদমেজাজী মানুষটা। কিন্তু রোগীদের কাছে? বিন্দুমাত্র রাগ, মেজাজ থাকে না তখন, তাই ঐ মানুষগুলোর জন্য সাক্ষাত দেবী। নয়তো আজ রুহিই শহরের কোন ফুটপাথেই হয়তো প্রসব করতো তার প্রথম সন্তান।

শান্ত চোখ, বাঁ হাতটা থুতনির কাছে হাত দিয়ে কোন ভাবনায় হারিয়ে ছিলেন মানুষটা কয়েক মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই বললেন, “ডিসিশনটা কী ভেবে নিচ্ছো?”

-“কী করবো ম্যাডাম, আমার পক্ষে এই অবস্থায় বাচ্চাটাকে নিয়ে কীভাবে টানবো আমি? না ওকে ভাল রাখতে পারব, না একটা সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যৎ আমি ওকে দিতে পারব। অনাথ আশ্রমে থাকলে অন্তত ওর মাথার উপর একটা ছাদ থাকবে, ও নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে পারবে হয়তো। আমি নিজের জীবনটাও শেষ করলাম, এবার ওর জীবনটা অন্তত…”

-“বয়স কত?”

-“মানে।।।?”

-“বলছি, এত যে পাকা পাকা কথা বলছ, তোমার বয়স টা কত? এত তাড়াতাড়ি যে বলে দিলে তোমার জীবন শেষ হয়ে গেছে, তা বয়সটাকত শুনি একটু।”

রুহি মাথাটা নীচু করে থেকে বলল, “১৯”।

-“তোমার লজ্জা করছে না, ১৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে জীবন আমার শেষ বলে গলা ফাটাতে, যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন তো পুরো জীবনটা পড়ে রয়েছে। কোথায় বলবে আমি আমার জীবনটা নতুন করে শুরু করতে চাই, লেখাপড়াটা শুরু করতে চাই, তা না। আজ তোমার জায়গায় যদি পিউ থাকত।।।” নামটা উচ্চারণ করেই সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেলেন নীলিমাদেবী। রুহি বোঝা না বোঝার মাঝে দাঁড়িয়ে তখনও।

-“যাক গে, ছাড়ো, তোমার জীবন তুমি বুঝবে, কিন্তু আমি বলব নিজের জীবনটা ভালোভাবে শুরু করো, ওকে নিয়েই। তারপরও ওকে যদি নিজের কাছে রাখতে সমস্যা থাকে তোমার, আমায় একবার জানিও।”

রুহির উত্তরের অপেক্ষা না করেই নীলিমাদেবী এপ্রোন আর স্টেথোটা নিয়ে রাউন্ডে বেরিয়ে গেলেন। ওনার এভাবে চলে যাওয়া দেখে রুহিও কোন উত্তর পেল না, আর উনি? হঠাৎ করে যেন কিছু একটা সামনে চলে এসেছে, দেখতে চান না উনি, তাই সেখান থেকে একপ্রকার যেন পালিয়েই এলেন মানুষটা।

****************

আজ মনটা ভীষণ অশান্ত লাগছে, একবার তাতানটার সাথে আজ কথা বলতেই হবে। বাড়ি ফিরেও অস্বস্তিটা কাটছে না। আজ খুব বেশী পেশেন্টের নামও নিলেন না। ভাল লাগছে না শরীরটা, মনটাও। পেশেন্ট দেখে উপরে উঠোনে যখন বসলেন, রাত ৮:৩০টা প্রায়।

খেতেও ইচ্ছে করছে না, হঠাৎ করে যেন এই ফাঁকা বাড়ি, এই একাকিত্ব, সবকিছু যেন গ্রাস করছে ভীষণভাবে। বেশ তো ছিলেন একা একা, সবাই তো চলে গেলো এক এক করে ছেড়ে, মা বাবা, অখিলেশ, আর তারপর ছোট্ট তাতান টাও কত বড় হয়ে গেল। যে আগে মার কাছে থাকার জন্য রীতিমত কান্না জুড়তে, সেই আজ তিনবছর প্রায় এই দেশ, এই বাড়ি থেকে কত দূরে। ওপাশের বারান্দাটা জুড়ে যখন দৌড়ে বেড়াত তাতানটা, আর তার পিছনে শাশুড়িমা, বা যখন জানলার মোটা গরাদ ধরে, বারান্দার রেলিঙ ধরে ঝোলাঝুলি খেলত, পাশের বাড়ির মিত্রদের ছেলের সাথে, সারা বাড়ি ওদের দস্যিপনায় রাত ১০টা তেও শান্ত হতো না। আজ সেই বারান্দা, সেই গরাদ, সেই রেলিঙ, সব একা দাঁড়িয়ে, পায়রাগুলো বকবকম জোড়ে। আর শীতকালের সঙ্গী ঝরাপাতা, আর কাল বৈশাখীর সময় সামনের দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়ার লাল হলুদ ঝরা ফুল ভরিয়ে দিয়ে যায় এই বারান্দা উঠোন।

****************

-“তোর মনে হয় ঐ মেয়ে, বাড়ি, বংশ না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু যে এত কেরিয়ারিস্টিক, সে রাখতে পারবে তোর খেয়াল? সারাদিন তো অফিস, মিটিং, ট্যুর করেই কাটিয়ে দেবে, সুন্দর করতে পারবে সংসারটা ?”

-“মা প্লিজ, তুমি কীরকমই একটা বিহেভ করছো। তোমার কথা শুনে মনেই হচ্ছে না তুমি একজন ডাক্তার। কী বলে যাচ্ছো, কোন যুক্তিতে? তুমি নিজেও তো কেরিয়ার…”

-“তুই ভুল জায়গায় কম্পেয়ারটা করছিস, এখানে তোর ঠাকুমা, দাদু, বাবা সব ছিল, তোরা একা ওখানে কীভাবে পারবি?”

-“মা, প্লিজ, তোমার ওকে পছন্দ না তার জন্য একটা এক্সকিউজ…”

-“তুই তর্ক করিস না তাতান, আমি অনেক ভেবেই বলছি, রান্নাবান্না করে খাওয়াতেও পারবে না, কী করবি তুই? ফেঁসে গেছিস তুই পুরো, সেটা বুঝছিস না।”

-“মা, তুমি না সুস্থ নেই, সিরিয়াসলি। এখন তোমার সাথে কথা বলে লাভ নেই, আমি বেরচ্ছি।” বলেই টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল আকাশ।।।”বাই দ্য ওয়ে, কালকের বাটার চিকেনটা কেনা ছিল না মা, ওটা পিউ-এর বানানো ছিল।”

***************

নীলিমাদেবীর চোখটা কখন লেগে গেছিল , চোখ খুলেই দেখেন, ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁইছুঁই। একটুর জন্য চোখটা শুধু বুজেছিলেন, আর।।। উঠে পড়লেন নীলিমাদেবী। ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত ভেবে ফোনটা লাগলেন নিউইয়র্কে, আকাশের ফোনটা রিং হয়ে কেটে গেল। এরকমই কিছু একটা এক্সপেক্ট করেছিলেন।

আজ বহুদিনপর চোখটা ছলছল করছিল কী একটু? আর কত? আর কত শাস্তি দিবি বুড়ো মা-টাকে? ভুল করেছি, মানছি, স্বীকার করছি তো, তাই বলে এরকম ছেড়েই চলে যাবি সব? ঐ মেয়েটাই আজ তোর সব হলো?

ভাবতে ভাবতেই চেয়ারটায় বসে পড়লেন নীলিমাদেবী, আজ শরীরটা একদমই সায় দিচ্ছে না, একটিবার ছেলেটার সাথে কথা বলতে চাইছে মনটা |

এই… এই তো… ফোন বাজছে। ফোন করছে আকাশ। তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরলেন নীলিমাদেবী।

-“হ্যাঁ রে, মাকে একটা ফোন করতেও মনে থাকে না তোর? এত ব্যস্ততা কীসের রে তোর?”

-“যা বাবা, তোমায় তো বলেই গেছিলাম তিনদিনের জন্য ট্যুরে যাচ্ছি, নেটওয়ার্ক থাকবে না, ফোন করতে পারব না। আজ এই তো ফিরলাম। আজই ফোন করতাম, কেন, কী হয়েছে বলো?”

-“কী হয়েছে জিজ্ঞেস করছিস, বুড়ো মা-টা একা বাড়িতে…”

-“মা, তুমি এমনভাবে বলছো, যেন তুমি সারাদিন বাড়িতে একা। আরে তুমি নিজেও তো ব্যস্ত, তুমি নিজেও তো সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে রাত্রে ফোনে কথা বলার সময়টুকু পাও। আর তাছাড়া আমি তোমায় বহুবার আমার কাছে চলে আসার জন্য বলেছি, তুমিই আসতে চাওনি। আর কেন বারবার তুমি আমায় ওই বাড়িতে যাওয়ার কথা বলো, তুমি তো জানো আমি কেন যাই না।”

-“তুই পিউ-এর জন্য নিজের বাড়ি…”

-“মা প্লিজ, যে নেই আজ, তাকে নিয়ে এখনও।।।”

কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তাতান আর কোন কথা না বলে ফোনটা রেখে দিল। নীলিমাদেবীও ফোনটা রেখে মাথা নত করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ । বারবার না চেয়েও কেন নিজেরই ছেলের যন্ত্রণার জায়গাটা খুঁচিয়ে তোলেন উনি। সব জানার, বোঝার পরও কেন করে ফেলেন ভুল টা? উনি নিজেও কী জানেন, উনি কী চান? পিউ-র হয়ে কথা বলেন কখনো তো কখনো ওর বিরুদ্ধে। আর কত সময় লাগবে ওনার? এতদিন পরও ওই অতীতেই পড়ে আছেন, আর তাতান যখন সব ভুলতেই চাইছে, ওকে সেই ক্ষতর জায়গাটায় ফিরিয়ে আনতে কেন চান? তাও তো তাতান সবটা জানে না…তাড়াতাড়ি উঠে মুখে চোখে জল দিয়ে, একটু কিছু মুখে দিয়ে আলো নিভিয়ে দিলেন নীলিমাদেবী। অতীত আজ আবার মাথা ছাড়া দিয়ে চোখের সামনে ভাসছে। আজ আর ঘুম হবে না হয়তো।।। তাও।।।