
-“বলছি কাগজটা রাখো, আর কোন জন্মে বাজারটা নিয়ে আসবে?”
-“ব্যস, শুরু হলো। এই মহিলা আমায় জীবনে যদি এতটুকু শান্তি দিলো।”
-“হ্যাঁ এখন তো এসবই বলবে। মেলা না বকে বাজারে যাও তো।”
এই বলে দত্ত গিন্নি বাজারের থলেটা বাড়ির কর্তা মানে ওনার স্বামী পরিতোষ দত্তর হাতে ধরিয়ে দিলেন।
-“আজ মেয়ে, জামাই, নাতনি আসছে তাই একটু মাছ মাংস নেবে ওদের পছন্দ মতো। তোমায় তো সবই বলে দিতে হয়।”
-“হ্যাঁ, তো হবে বলে দিতে, তা নয়তো কি আমি কি তোমার ভাঁড়ার খুঁজে জিনিস কিনে আনব নাকি? যত্তসব !
-“এই নাও ফর্দ, ফর্দ না দিলে তো আলুর বদলে শাকালু আর চিড়ের বদলে মিছরি এনে হাজির করো। নাও এবার নড়ে চড়ে যাও তো। তোমার জ্বালায় এখন সাত বেলা অবধি রান্না ঘরে খাটতে হবে।”
-“কেন, আমার বাজার-এর সাথে সাতবেলা অবধি রান্না ঘরে থাকার কি সম্পর্ক?”- দত্ত বাবু ঝাঁঝিয়ে ওঠেন ।
-“তো তুমি হেলেদুলে বাজারটা এনে দিলে তো পঞ্চব্যঞ্জন রেঁধে নামাবো।”
-“তো আমি কি মাথার দিব্যি দিয়েছি যে আমায় পঞ্চব্যঞ্জন রেঁধে খাওয়াও?”
-“তো মেয়ে জামাই আসছে এটুকু করবো না?”
-“তো আমায় দোষ দিলে কেন তুমি?”
।।।।।।এই ঝগড়া একটি ‘নেভার এন্ডিং প্রসেস’, চলতেই থাকে, ৭ দিন ২৪ ঘন্টা। বৌমা মানে দত্তবাবুর ছেলের বৌ এসে সামাল দিলেন, নয়তো আরও চলতো।
এই ঘটনা রোজকার। আমাদের ফ্ল্যাট থেকে রোজই শুনি। এখন এমন হয়ে গেছে ঝগড়া না শুনলে দিনটা ফ্রেশভাবে স্টার্ট-ই হয় না।
মেসো আর মাসিমা মানে মিঃ ও মিসেস দত্ত, ছেলে, বৌ, নাতিকে নিয়ে আমাদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন। আজ ওনাদের মেয়ে জামাই আসবে তাই এতো তোড়জোড়। আমি আর প্রবাল, মানে আমার স্বামী, এখানে থাকি বিগত এক বছর হলো, আমাদের বিয়ের পর থেকেই। এই জানুয়ারিতেই আমাদের এক বছর হলো বিয়ের।
আমি তো বুঝি না এতো সমস্যা আর ঝগড়া নিয়ে দুটো মানুষ কিভাবে একসাথে এত বছর কাটিয়ে দিলো। এদের মধ্যে ভালোবাসা আদৌ ছিল, আছে? নাকি পুরোটাই অভ্যাস?
******************
বিকেলে বাজার থেকে ফিরছি, আমাদের আবাসনে একটা পার্ক আছে, প্রায়ই যাই ওখানে, দেখলাম দত্ত মাসিমাও যাচ্ছেন। ভাবলাম একটু গল্প করে আসি।
-“ভালো আছেন মাসিমা ?”
-“হ্যাঁ মা, বসো। কি ব্যাপার মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে ?”
-“না আসলে অফিস-এ কাজের চাপ, তার ওপর আবার বাজার সেরে ফিরছি, ভাবলাম একটু পার্ক-এ বসে যাই। এতসুন্দর আবহাওয়া আর পরিবেশ, অসংখ্য ধূসর-এর মাঝে এক ফালি সবুজে মনটা সতেজ হয়ে যায়।”
-“খুব খাঁটি কথা বলেছো মা। বসো একটু, এই নাও একটু চিড়ে ভাজা খাও।”
এই ভাবেই গল্প চলতে লাগলো। মাসিমার কত ছোট বয়সে বিয়ের কথা, ওনাদের আদি বাড়ির কথা, সবই আমার মাসিমার থেকে এই গল্প শুনেই জানা। কথা বলতে বলতেই মাসিমার ছোট মুঠোফোনটা বেজে উঠলো। ওপাশের গলা খাঁকারিতে বুঝলাম দত্ত মেসো। অস্পষ্ট ভাবে শুনতে পেলাম -” এই শীতের সময় এতক্ষন ধরে পার্কে বসে কোন কাজটা উদ্ধার করা হচ্ছে শুনি? আবার ঠান্ডা লাগিয়ে হাজার টাকা গচ্ছা যাবে আমার।”
দত্ত মাসিমা ফোনটা কেটে দিলেন,”আর এই বুড়ো, আমায় এতটুকু জীবনে শান্তি দিলো না, মাথা খেয়ে রেখে দিলো। ছাড়োতো ।”
এই ভাবেই টুকটাক ওনার মেয়ে জামাই, নাতি নাতনি, সব নিয়ে গল্প হতে হতে বেশ খানিকটা সময় গড়িয়ে গেলো। কাল অফিসে ছুটি আর আজ প্রবাল এলে বাইরে ডিনার-এ যাবো, তাই আমারও তাড়া নেই। এমন সময় মাসিমা বললেন, “আমি এবার আসি মা, তোমার মেসো মশাই-এর ক্ষীর খাবার সময় হলো । আমার হাতে ছাড়া খাবে না। আমি এবার উঠি।”
-“হ্যাঁ হ্যাঁ, চলুন আমিও উঠি।”
একসাথেই ফ্ল্যাটে ফিরলাম। ফ্রেশ হয়ে রেডি হতে হতে ভাবছিলাম, ওদিকে এত ঝগড়া, আবার এত যত্ন। মাসিমা তো তাহলে খুবই ভালো , মেসো মশাই-ই কি তাহলে বুঝলেন না? কি জানি?
******************
রাতে বাড়ি ফিরতে অনেকটা দেরি হলো, তাই সকালে ঘুমও ভাঙেনি, তার ওপর আজ ছুটি। রোজকার মতো মাসিমা মেসোর চিৎকার শুরু হয়েছে। আজকের টপিক শীত পড়া ইস্তক মেসো মশাই শ্যাম্পু-সাবানের পাঠ তুলেছেন, তাই মাসিমার বক্তব্য – “এই নোংরার ডিপোর সাথে উনি এক ঘরে থাকতে পারবেন না।”
ঘুম ভাঙা অলস শরীরে যেটুকু শুনলাম-
-“তোমার মতো নোংরা লোকের সাথে কোনো সুস্থ মানুষ ঘর করতে পারবে না।”
-“তো কে বলেছে ঘর করতে? যেদিকে খুশি যাও না বাপু।”
-“সে তো যাবোই । যেদিন চোখ বুজবো শান্তি, তোমারও আমারও”।
-“তখন তো আমি যতখুশি যা খুশি করতে পারবো, তোমার টিকটিক শুনতে হবে না অন্তত।।।”
সত্যিই এই মানুষ দুটিকে কখনো ভালোভাবে কথা বলতে দেখলাম না দুজনের সাথে । যাকগে, প্রবালকে জড়িয়ে আবেশে চোখ বুজলাম ।
(কয়েক দিন পর… সকাল বেলা)
“চা টা ঠান্ডা হয়ে গেছে, আর এক কাপ দিলে ভাল হয় “- দত্ত বাবু।
“তা কি এত রাজকার্য করছিলে শুনি, ওই এক ডায়েরি লেখা, কত বড় কাজই না করছো। কোনোদিন তো দেখলাম না কি আছে ওই ডায়েরি তে।”- দত্ত মাসিমা বললেন।
এরকমই টুকরো ঝগড়া শুনতে শুনতে আমি আমার কাজ সারতে লাগলাম। অফিস-এর তাড়াও আছে, লেটও হয়ে গেছে।
বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম, আমাদের আবাসনের নীচে অ্যাম্বুলেন্স। কার আবার কি হলো কে জানে? ফ্ল্যাটে উঠতেই দেখলাম দত্ত মেসোদের ফ্ল্যাটের সামনে জটলা । আমার বুকটা ধক করে উঠলো ।
মাসিমার সম্ভবত হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে । আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না, এই তো সকালেও সব ঠিক ছিল ।
মাসিমাকে অ্যাম্বুলেন্স-এ করে ওনার ছেলে, জামাই রওনা দিলেন । মেয়ে, বৌমা ফ্ল্যাটেই রইলেন । দত্ত মেসোর চোখ দুটো দেখে আজ বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো, এমন শূণ্যতা ভরা দৃষ্টি না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না, যেন কিছু হারানোর তীব্র ভয় ওনাকে গ্রাস করেছে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বারান্দায় উনি ওনার ইজি চেয়ারটায় বসে রইলেন।
(দুদিন পর)
আজ দত্ত মাসিমা মারা গেছেন। আমি নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। এত হাসিখুশি সুস্থ একটা মানুষ এভাবে চলে যাবে স্বপ্নেও ভাবিনি।
দত্ত মেসো আর মাসিমার ঝগড়ার কথা সর্বজনবিদিত তাই হয়তো কানাঘুষো শুনতে পেলাম,”বুড়ি মরলো, এবার বুড়ো বাঁচলো।” ওপরের ফ্ল্যাটের রিনাদি বিজ্ঞের মতো বলছেন,”দুজনের সম্পর্ক তো মোটে ভালো ছিল না। কোনোদিন ভাল কিছু দেখিনি। এই দত্ত গিন্নি মরলো, বুড়োর তো শান্তি হলো গো।” আশপাশের সবাই সম্মতি দিয়ে একই কথা বলছিলো।
আমি দত্ত মেসোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম, আজও মানুষটার চোখে একবিন্দু জল নেই। পাষান নাকি মানুষ? যেন কিছুই হয়নি। মানুষের মন এত পাথরও হয়? এত বছরে এতটুকু ভালোবাসা জন্মালো না? এও হয়?
সব কাজ মিটলো। আমরা শ্মশান থেকে বাড়ি ফিরলাম, অত্যন্ত ক্লান্ত। কাল অফিস আছে, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। শুধু, মনটা খচখচ করছিলো, মাসিমা এত ভালোমানুষ অথচ কোনদিন ভালোবাসা পেলেন না, এসব ভাবতে ভাবতেই কখন ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতে পারিনি।
পরদিন সকালে চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙলো এখন তো আর দত্ত মাসি নেই, তাহলে আবার কিসের চিৎকার? বোঝবার চেষ্টা করলাম। উঠে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দেখি, দত্ত মেসোর ঘর বন্ধ, দরজা খুলছে না। এসব দেখেই মনটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো।
অনেক ধস্তা ধস্তির পর দরজাটা শেষ মেশ ভাঙতেই হলো। দত্ত মেসো উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছেন। সকলে ধরা-ধরি করে খাটে শোয়ানো হলো। ডাক্তার এলো, কিন্তু ততক্ষনে সব শেষ, মেসো আর নেই । আমি ততক্ষনে অফিসে ফোন করে দিয়েছি, আর হবে না অফিস যাওয়া।
কিন্তু এও কি সম্ভব? পর পর দু’দিন দুটো মানুষ এভাবে চলে গেলো !
ফ্ল্যাটের বাইরে লোক ভেঙে পড়েছে। মৃতদেহ নিয়ে বেরতে বেরতে প্রায় বিকেল। প্রবাল গেলো শ্মশান, আমি ফ্ল্যাটেই ছিলাম।
বৌদি, মাসিমার মেয়ে, শোকে বিহ্বল। কে কাকে সামলাবে? ছোট নাতিটা পর পর দাদু দিদাকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছে, ওকে একটু ঘুম পাড়ালাম, ঘুমিয়ে থাকলে যদি একটু ভালো লাগে ।
চোখ পড়লো কালো মোটা একটা ডায়েরির দিকে, এমনিই ওল্টাতে গিয়ে দেখলাম, এটা দত্ত মেসোর ডায়েরি । বুঝতে পেরেই রেখে দিতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ, একটা লাইনে চোখ আটকে গেলো -“তুমি তো কথা দিয়েছিলে সাবিত্রী, আমরা কখনও আলাদা হবো না।”
নিজেকে আটকাতে পারলাম না, অন্যের ডায়েরি পড়া ভুল জেনেও পড়ে ফেললাম-
“সারাজীবন একসাথে থেকেছি। তুমি আমার জীবন আমার থেকে কেড়ে নিলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো? আমি জানি তুমি আমার কষ্ট কোনদিন সহ্য করতে পারবে না। তুমি তোমার কথা ঠিক রাখবে, আমার প্রাণকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও সাবিত্রী । তোমায় না দেখে, তোমায় না ভালোবেসে, তোমায় না কাছে পেয়ে আমি বাঁচতে পারবো না। আমায় তোমার কাছে নিয়ে যাও।।।।।।।।”
ব্যস এর বেশি আর পড়ার ক্ষমতা আমার ছিল না। এত টানও হয়? ভালোবাসা কাকে বলে, আমি এই মুহূর্তে সেটা উপলব্ধি করলাম। ভালোবাসার সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম। প্রবালের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। চোখ জলে ভিজে গেছে। এই দুটো মানুষ শক্ত আবরণের নীচে তাদের কোমল ভালোবাসাটা শেষদিন পর্যন্ত সযত্নে রেখেছিলো, যা আমরা অনেকেই পারি না। এটা কি শুধু ভালোবাসা? নাকি আরো বেশি কিছু।