-“মম, আমাদের গাড়ি এই দিকে আছে, এদিকে এস |”
-“ওহ, হ্যাঁ, চল |”
আজ দীর্ঘ দশ বছর পর পা রাখলাম দেশের মাটিতে | দমদম এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি ছুটলো সল্টলেকের দিকে |
আমি মীনাক্ষী সেন, আমার স্বামী একজন বিখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জন, ডঃ রঞ্জন সেন | আমাদের একমাত্র মেয়ে প্রিয়দর্শিনী সেন, ১৭ বছর বয়স | কর্মসূত্রে এখন আমরা আমেরিকার বাসিন্দা | আজ বহুদিন পর ভাসুরের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে কলকাতা আগমন |
হু হু করে ছুটছে গাড়ি | বিলাস বৈভব, অর্থ, যশ, সম্মান কোন কিছুরই অভাব নেই | আপাতদৃষ্টিতে যে কেউ দেখে বলবে আমি খুব সুখী, বলেও সবাই | আমি ভাগ্যবতী খুব যে এরকম সংসার পেয়েছি, কিন্তু আমি মন থেকে কেন বলতে পারি না যে হ্যাঁ আমি সত্যিই সুখী | এই কুড়ি বছর মনের মধ্যে একটা ক্ষত চাপা দিয়ে চলেছি | আস্তে আস্তে সেই বিষাক্ত ক্ষত সারা মনে ছড়িয়ে পচন ধরে গেছে যেন, রক্ত ক্ষরণ যে এবার শুরু হবে বুঝতেই পারিনি |
**************
আমার মেয়ে প্রিয়দর্শিনী, মানে আমার পিউ | ওই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ | স্বামী তার কাজের ধরনের জন্য সারাজীবন-ই ব্যস্ত | একই টেবিলে খেতে বসলেও আমাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল যেন কয়েকশ যোজনের | স্বামী তার কোন ইম্পর্ট্যান্ট কল বা ল্যাপটপে কাজে ব্যস্ত, আর আমি নিজের মতো সম্পূর্ণ একা | দুইজন বিশাল ডাইনিং টেবিলের দুই প্রান্তে | পিউ আসার পর থেকে আমি পিউকে একমুহূর্তের জন্যও কাছ ছাড়া করিনি | এমনিতেই মা আর মেয়ের বন্ডিংটা খুব শক্তই হয়, পিউ আর আমারও তাই | ওর মা কম বন্ধু বেশি আমি, পিউও ওর মাকে ছাড়া কিছু বোঝে না |
না, স্বামী যে আমার মনের খবর রাখার চেষ্টা করেনি তা নয় | অবশ্যই করেছে, আমায় হয়তো ভালও বেসেছে | ‘হয়তো’ শব্দটা জরুরি এখানে তাই বলতেই হলো, কারন ভালবাসলেও সেই ভালবাসা কোনোদিন আমার মন অবধি পৌঁছায়নি | বলা ভাল আমিই পৌঁছাতে দিনি | মনের ভিতর সুবিশাল প্রাচীর তুলে রেখেছিলাম বিয়ের দিন থেকেই | সেই প্রাচীর ভেদ করুক কেউ আমি চাইওনি, রঞ্জন পারেওনি |
এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে, টালমাটাল হয়ে সংসারটা টিকে গেছে | তবে কেউই নিজের দায়িত্ব ভুলিনি, দায়িত্ব পালনে কোন ত্রুটি রাখিনি |
||২||
গাড়ি থামল সেন ভিলার সামনে | এটা আমার শ্বশুরবাড়ি, বিয়ের পর প্রথম পা এখানেই রেখেছিলাম, তারপর যদিও পাড়ি দিয়েছিলাম বিদেশে | আজ এতদিন পর এই বাড়িতে পা রেখে অতীতে স্মৃতিচারণ করতে লাগল মনটা | খুব কমদিন থাকলেও এই বাড়িটা আমার মনের খুব কাছের | কারণ, রাধারানী সেন,ওই একটি মানুষ যে আমায় বুঝেছিল, আমায় চিনেছিল, আমার নিজের মা না হয়েও | তাই তাকে ছেড়ে যখন চলে যেতে হয়েছিল, তখন কষ্টটা অবর্ণনীয় ছিল | আমার শাশুড়ি মা, আজ উনি নেই | শেষ এসে ছিলাম ওনার মৃত্যুর সময়ে | বিয়ের কুড়ি বছর-এর মধ্যে এটা তার পর দ্বিতীয় বার আসা | ভাশুর, দেওর, জা, তাদের ছেলে মেয়ে, আমার শ্বশুর মশাই, এরা সবাই এখানেই থাকেন |
আমাদের থাকার ঘরটা খুলে দেওয়া হয়েছে | ঘরের সামনের লাগোয়া বারান্দার সামনে একটা জুঁই গাছ ছিল, সুন্দর গন্ধ ছড়াতো সারা ঘরে, আজ বারান্দাটা একাই দাঁড়িয়ে আছে | আমাদের ঘরে আমাদের বিয়ের ছবিটা বড় করে বাঁধিয়ে দেয়ালে টাঙানো ছিল, যেটা এখনও সেখানেই আছে | লাল বেনারসীতে আমি তখন বড্ড দিশেহারা | এক মাথা সিঁদুর নিয়ে অজানা অচেনা একজন মানুষের পাশে অনেক দ্বিধা সংকোচ নিয়ে দাঁড়িয়ে | সেই সংকোচ সেই বিরক্তি যেন চোখে ফুটে উঠেছে | একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীতের পাতা থেকে বেরিয়ে এলাম |
||৩||
পিউ খুব ধরেছে, মা তোমার স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি সব দেখব | মেয়ের কোন কথাই ফেলি না, ঘুরে দেখলাম সব | এখন রাস্তাঘাট কত বদলে গেছে, কত উন্নত হয়ে গেছে | শপিং মল-এ ছেয়ে গেছে শহরটা | স্বাভাবিকই সবুজ কমে ধূসরের বাড়বাড়ন্ত, সব মিলিয়ে আমার স্মৃতির কলকাতার সাথে কোন মিলই নেই | শেয়ালদায় ইউনিভার্সিটি টা থেকে ঘুরে গেলাম কাছাকাছি একটা শপিং মল-এ | উফফ এই মেয়ের জ্বালায় মাথা খারাপ, আমায় ফুড কোর্টে বসিয়ে মেয়ে গেল অর্ডার দিতে, ফুড কোর্টের একটা কোনের টেবিলে বসে কাঁচ দিয়ে তখন আমি দেখছি ব্যস্ত শহরটাকে |
বিয়ের পর মাস কয়েক ছিলাম সেন ভিলায় | তারপরের থেকে নিজের শহরটাকে ঘুরে দেখার সুযোগ এই হল |
যতই বিদেশে থাকি, নিজের শহর তো নিজেরই হয় | প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিয়েও সুখ |
….এসব ভাবতে ভাবতেই চোখ গেল রাস্তায়, ঐ মানুষটার উপর | নাহ, আমার অন্তত চিনতে কোন ভুল হয়নি, আগের থেকে চেহারা অনেকটাই ভারী হয়ে গেছে, বয়স হয়েছে তো | হাঁ করে দেখছিলাম মানুষটাকে, এভাবে হঠাৎ দেখতে পাব ভাবতে পারিনি যে, এতদিন পর | তাই মেয়ের মা হয়ে গেছি তা সত্ত্বেও চোখ দুটো যেন সেই অষ্টাদশী মিনুরই আছে, যে তার আশীষদাকে দেখার জন্য ব্যাকুল থাকত | কখন যে চোখ জলে ভিজে গেছে বুঝতে পারিনি |
আশীষদা মল-এর সামনে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে | ভাগ্যিস মিনুকে দেখতে পায়নি | রক্তক্ষরণটা মনের মধ্যে শুরু হয়েই গেল, পারছিলাম না নিজেকে শান্ত রাখতে | আর আজ এতদিন পর যে যন্ত্রনা, যে কান্না গলার মধ্যে আটকে ছিল, যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে |
-“মম, whats wrong with you? কাঁদছো কেন?”
-“শরীরটা ভাল লাগছে না, চল প্লিজ এখান থেকে |”
মেয়েকে মিথ্যে বলে অতীত-এর স্মৃতি থেকে হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠা অভিশপ্ত অধ্যায়টাকে এড়াতে চাইছিলাম | চাইবো নাই বা কেন? যা শুধু যন্ত্রনা দিয়েছে তাকে জীবন্ত করে লাভ কি?
গাড়িতে ওঠার সময় চোখাচোখি হয়েই গেল | আশীষদা মাটির ভাঁড় হাতে চা-এ চুমুক দিতে ব্যস্ত ছিল | সামনে মীনাক্ষী সেনকে দেখতে পাবে ভাবতে পারেনি | মিনু থেকে মীনাক্ষী সেন হওয়া মানুষটাকে দেখেওনি এর আগে |
না, কোন কথা হয়নি বা প্রয়োজনও হয়নি কিছু বলার | গাড়িতে উঠে কাঁচটা তুলে দি, আশীষদার চোখ বাঁচিয়ে আশীষদাকেই শেষ বারের মত দেখব বলে | কি জানি আর দেখা হয় কিনা এজন্মে | আর রইলো বাকি কথার? চোখ দুটোর ভাষাই যে সব কথা বলে ফেলে, তাই তো চোখ লুকোনোর আপ্রাণ চেষ্টা |
*****************
ফেরার পর থেকে নিজেকে শান্ত রাখা খুব মুশকিল, স্বাভাবিক | নিজের প্রথম প্রেমটা যখন কবর ভেঙে আবার সামনে চলে আসে, সামলানো কী এতই সোজা? আমিও পারছি না তাই |
||৪||
বিয়ে বাড়ি পুরো দমে জমে উঠেছে | এখনকার বিয়ে অনেক আলাদা, সংগীত, মেহেন্দি কত কী না হয়?
আজ মূল বিয়ে | পিউ আমার কাছ থেকে কিছুই লুকোয় না, আজও তার অন্যথা হলো না | প্রেমে পড়েছে আমার মেয়ে | ছেলেটি পাত্রীর ভাই,কলেজে পড়ে | কবে কখন কিভাবে হলো এসব জিজ্ঞেস করে অস্বস্তিতে ফেলার কোন ইচ্ছা নেই | শুধু বললাম,”বিয়েটা মিটুক, কিছু কথা বলব, সব শুনে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে |
******************
কাল বৌভাত, আজ বৌ বাড়ি এল | সারাদিনের কাজের শেষে ক্লান্ত আমি বারান্দায় বসে একটু চোখ বুজেছিলাম |
বিশ্রাম নেওয়া আর হলো কই,মেয়ে হাজির |”কী বলবে, বললে না তো মা? বল না, বল না |”
মাথা খারাপ করে দেবে যতক্ষণ না বলব এবার | চোখ বুজেই বলতে শুরু করলাম-
“তোকে আজ এই কথা গুলো বলার একমাত্র কারণ যাতে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গুলো নিতে কোন ভুল না করিস | ভালবাসতে গেলে অনেক সাহসের দরকার, অনেক গতানুগতিকতা কে ভাঙার জোর থাকা দরকার | তুই এখন অনেক বড় হয়েছিস | বলার সময়ও হয়েছে | প্রায় ২৮ বছর আগের একটা ঘটনা, তবুও এতটুকু আবছা হয়নি | ছেলেটা ছিল খুব সাধারণ ঘরের, মেয়েটাও তাই | বাবার একমাত্র মেয়ে, তাই মেয়ের বিয়ে নিয়ে অনেক সাধ ছিল | ছেলেটা আর মেয়েটার বর্ণ এক ছিল না | ছেলেটি ব্রাহ্মণ,মেয়েটি অব্রাহ্মণ, তবুও ওদের মধ্যে প্রেম হয়েছিল | দীর্ঘ ৮ বছরের একটা সম্পর্ক যেটা অনেক ভালবাসা,বিশ্বাস, অনেকখানি যত্ন নিয়ে একটু একটু করে গড়েছিল ওরা | শুধু বুঝতে পারেনি ঘর বাঁধার জন্য শুধু এতটুকু থাকলেই হয় না | তার সাথে সমাজ জুড়ে দেয় অজস্র শর্তের পাহাড় | যে পাহাড় ভেদ করা আর হয়ে ওঠেনি ওদের |
ছেলেটির গায়ে তখনও বেকারত্বের তকমা লেগে আর মা মরা মেয়েটির ক্যান্সার আক্রান্ত বাবা চায় মেয়েকে যোগ্য পাত্রের হাতে তুলে দিয়ে চোখ বুজতে | মেয়েটির মা ভিন্নবর্ণের মেয়েকে মানবেন না দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন | এত কিছু পেরিয়ে ওদের আর এক হওয়া হয়নি, হয়তো কারও দোষ ছিল না | হয়তো বা ছিল | দুজন মানুষ একে অপরকে অসম্ভব ভালবেসেও যখন একে অপরের থেকে পরিস্থিতির চাপে সরে যায় সারা জীবনের জন্য তখন, তার থেকে বেশি যন্ত্রণার আর কিছু হয় না | এমন একজনকে সাথে নিয়ে চলা যে অচেনা, নিজের ভালোবাসাকে গলা টিপে খুন করে তার ওপর মেকি সংসারের নাটক | কোনো কিছুর সাথেই এই যন্ত্রণার তুলনা হয় না …”
বলতে বলতেই গলাটা বুজে এল যন্ত্রনায় | পিউ হাতটা ধরে বলল,”মা? আমার তাহলে কী করা উচিত?”
-“তুমি সেটাই করবে যাতে তোমার মন সায় দেবে, আর নিজের মায়ের মত কষ্ট পেয়ো না, নিজের ভালবাসাকে যেন কোনভাবেই বলি না দিতে হয়, সে ব্যবস্থাটা করার ক্ষমতা থাকলে, মেরুদণ্ডটা শক্ত থাকলে, তবেই এগিও, তোমার মা যা পারেনি… বলতে দ্বিধা নেই |”
-“আচ্ছা মা, তাহলে কী তুমি ড্যাড কে কোনদিনই ভালবাসনি?”
-“কী জানি, হয়তো বেসেছি, হয়তো বা বাসতে পারিনি | তবে প্রেমকে নিজের মন থেকে একচুলও সরাতে পারিনি, বা চাইওনি | তোমার বাবা চেষ্টা করেছিলেন খানিকটা, আমার মনের নাগাল পেতে | কিন্তু প্রাচীরটা রয়েই গেছে | এই কথাগুলো আজ তুমি জানলে, আর জানত একমাত্র তোমার ঠাকুমা রাধারানী দেবী | ঐ একটা মানুষ বুঝেছিল আমায়, কিন্তু জানত ভবিষ্যৎ কেউ খন্ডাতে পারে না | মনের ভিতর সব চাপা দিতে বলেছিল, আমি তাইই করেছিলাম | তোমার বাবাও কোনদিন এসব জানতে পারেনি | তোমার ঠাকুমাই চাননি | কিন্তু ঐ মানুষটাই আমার চোখের জল মোছাতো | তাই উনি আমার শ্বাশুড়ি মা নন, নিজের মা-ই |”
******************
বৌভাতের পরদিন ক্যাটারিং-এর মালিক টাকা নিতে এসেছিল | বারান্দায় অন্যমনস্ক দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ দেখলাম সেই চিরপরিচিত অবয়বটা আবার | আশীষদার সাথে চোখাচোখি হতেই আমার মনের রক্তক্ষরণটা আবার শুরু হলো, সেই রক্তটাই চোখ দিয়ে জল হয়ে নেমে এলো | আশীষদার চোখটাও কী একটু ভিজে ছিল? কী জানি?
হঠাৎ খেয়াল হলো বৌভাতের ক্যাটারিং সার্ভিস-এর নামটা ‘মিনু ক্যাটারার্স’ | রাস্তার এপার-ওপর থেকে শুধু দুটি দীর্ঘশ্বাস পড়ল যার সাক্ষী রইলো না কেউ |
