বাড়ি কিনে এই পাড়ায় এই হপ্তাখানেক হলো এসেছি | আমার বাড়ির কাছেই একটা খুব সুন্দর পার্ক আছে | এসে থেকে এখনো যাওয়া হয়নি | ভাবলাম মর্নিং ওয়াক আবার স্টার্ট করা যাবে , আর প্রকৃতিকে একটু দেখাও হবে | আমার বাড়িতে আমি, আমার স্ত্রী, আমার মেয়ে, আর মা বাবা, এই আমাদের ছোট সুখী সংসার | বৌকে রাত্রে নিজের মর্নিং ওয়াক স্টার্ট করার কথা বললাম | বৌ এমন ভাবে তাকালো যেন এতবড় উপহাস পৃথিবীতে আজ অবধি কেউ করেনি | আমিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঢপবাজ | যাই হোক এর একটা জবাব দিতে হবে, ভেবে ঘড়ি তে এলার্মটা লাগিয়ে শুলাম |
পরদিন পার্কে সকাল সকাল পৌঁছে গেলাম | বাহ্ পার্কটা সত্যিই সুন্দর আর বাড়ি থেকে কাছেই দেখে সত্যিই ভালো লাগলো | দৌড় শুরু করলাম | দৌড়ে হাঁপিয়ে গেলাম, ব্যাপারে ! এই ভুঁড়ি নিয়ে হয় নাকি ? কিন্তু নাহ থামলে চলবে না | যাক গে, বেঞ্চে একটু জিরিয়ে নি, এই ভেবে বেঞ্চে বসলাম | দারুণ পরিবেশ, দারুণ | বদলি হয়ে ইস্তক ভালো করে দম ফেলা হয়নি, তাই মন ভরে ভোরের প্রকৃতির সৌন্দর্য্য চোখ ভরে দেখতে লাগলাম, কত গাছ | এখানে তো চারিদিক ধূসর | এই জায়গাটা বেশ শান্তির | ঘন্টার আওয়াজ পড়তে চমকে তাকালাম পিছন দিকে | ওবাবা ! মন্দিরও আছে একখানা ভারী সুন্দর |
একজন, আমার থেকে ছোটই হবে, একটি ছেলে মন্দির থেকে এসে আমার বেঞ্চেই বসলো |
তাকিয়ে বললো,” নতুন নাকি? আগে তো দেখিনি |”
আমি হেসে বললাম, ” হ্যাঁ, এই কিছুদিন হলো এই পাড়ায় এসেছি, আপনি কি এখানকার লোকাল?
ভদ্রলোক বললেন,” হ্যাঁহ ! আমিও এই ব্যানার্জী পাড়ারই “
“আচ্ছা তো কে কে আছেন আপনার পরিবারে?”-ভদ্রলোক |
আমি-” আমি, স্ত্রী, কন্যা, মা, বাবা এই ,ব্যস “|
ভদ্রলোক,”বাহ্! দারুণ দারুণ সুখী মানুষ তো মশাই আপনি, একবারে ভরা সংসার “|
আমি মাথা নেড়ে হেসে বললাম,” আপনারা কজন ?”
ভদ্রলোক,” আমি আর আমার স্ত্রী “|
আমি,” আচ্ছা তো কি করা হয় ?”
ভদ্রলোক,” আমি ছবি আঁকি, আর্টিস্ট বলতে পারেন “|
আমি,”এতো দারুণ ব্যাপার মশাই | আমি সরকারি চাকুরে | তা আর্টিস্ট মানুষের সাথে আলাপ জমাতেই হচ্ছে “|
ভদ্রলোক,”নিশ্চয়, একদিন নেমন্তন্ন করবো “|
“উঠি তাহলে”, এই বলে সেদিনের মতো গল্পে দাঁড়ি টেনে উঠে পড়লাম | সারাদিনের রুটিন মাফিক কাজ চলতে লাগলো | রাত্রে আমার মেয়ে তিতলিকে ছবি আঁকতে দেখে মনে পড়লো ভদ্রলোকের কথা | ইস ভদ্রলোকের নামটা অবধি জিজ্ঞেস করা হয়নি | স্ত্রীকে বললাম ” আজ একজনের সাথে আলাপ হলো জানো, সে যে সে নয়, আর্টিস্ট “|…….. এইসব নিয়ে গল্প চলতে লাগলো | রাত বাড়লো, ঘুমিয়েও পড়লাম |
পরদিন সকালে পার্কে পৌঁছাতেই দেখি কালকের ভদ্রলোক রীতিমতো ক্যানভাস নিয়ে পার্কে ছবি আঁকছেন,” আরে মশাই কি খবর? আজ পার্কেই শিল্প চর্চা ?”
ভদ্রলোক হেসে বললেন,” হ্যাঁ, এর থেকে ভালো জায়গা আর কি হতে পারে?”
আমি-” আপনার নামটাই কাল জানা হয়নি, আমি নিতাই মুখার্জী “|
“আমি রঞ্জন মল্লিক”, ভদ্রলোক বললেন, “আপনি আমাকে তুমি করে বলুন, আমি আপনার থেকে খানিকটা ছোটই |”
এভাবেই আপনি থেকে তুমি | আমি ওকে রঞ্জন আর ও আমাকে নিতাইদা বলে সম্বোধন শুরু হলো | রঞ্জন খুব ট্যালেন্টেড একজন মানুষ | খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ওর আমার ভালো সম্পর্ক হয়ে গেলো | কথায় কথায় জানতে পারলাম এখানে রঞ্জন আর ওর স্ত্রী বেশ কিছু বছর ধরেই আছে | বাড়ির লোকের কথা কখনো শুনি না, আমিও যেচে জিজ্ঞাসা করিনি |
রঞ্জন যে ওর স্ত্রীকে খুবই ভালোবাসে সেটা ওর কথাতেই বুঝতে পারি | সমস্ত কথার মধ্যে বেশির ভাগ কথাতেই ওর স্ত্রীর কথায় কোন না কোন ভাবে যাবেই |
একদিন কথায় কথায় জানতে পারলাম, রঞ্জনরা পালিয়ে বিয়ে করেছিল বাড়ি থেকে মানেনি বলে | সেই থেকে বাড়ির সাথে কোন যোগাযোগ নেই তেমন |
একদিন খয়েরি মলাটে মোড়া একটা বাঁধানো ছবি দেখলাম সঙ্গে নিয়ে এসেছে | বললো, ” স্নেহার জন্মদিনে এটা গিফট করছি ওকে, তোমায় দেখাতে আনলাম “| দেখি রঞ্জনের নিজের হাতে আঁকা এক অপরূপ নারী মূর্তি |
আমি বললাম, “ইনিই কি তোমার স্ত্রী?”
রঞ্জন একটু লজ্জা পেয়ে বললো,”হ্যাঁ , ভালো গিফট হবে না বলো?”
আমি বললাম,”দুর্দান্ত “|
এভাবেই আমাদের আলাপ প্রায় মাসখানেক গড়িয়ে গেলো | আমি বাড়ি ফিরে রঞ্জনের গল্প জুড়লেই গাল খাই | আমার স্ত্রী বার বার এটাই বলে,” দেখো নিজের বৌকে আজও কেমন ভালোবাসে, দেখে শেখ কিছু”| আমি মনে মনে ভাবি,’হ্যাঁ আর কিছু বছর যাক, রঞ্জনও লাইনে চলে আসবে’|
পরদিন রঞ্জন আমায় নিমন্ত্রণ করলো ওর স্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে, সপরিবারে যেন যাই | স্নেহা নাকি দারুণ রান্না করে | আমাদের সাথে আলাপ করার খুব ইচ্ছা | রেঁধে খাওয়ানোর খুবই ইচ্ছা, আমরা যেন অবশ্যই আসি | না বলার কোন উপায়ও নেই | আমরা কন্ফার্ম করে দিলাম |
আমার স্ত্রীও অনেকদিন থেকে উৎসাহিত ছিল | ওকে বললাম একটা বার্থডে গিফট কিনে রাখতে আর রেডি হয়ে থাকতে, সন্ধে বেলাই নেমন্তন্ন | ছোট তিতলিও খুব খুশি, এখানে এসে থেকে কারও বাড়ি যায়নি তেমন |
সন্ধেবেলা ফিরে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম | রঞ্জনের থেকে ঠিকানা নিয়েই নিয়েছিলাম, সেই মতো পৌঁছাতেও দেরি হলো না |বাড়িটা একটু ভিতর দিকে, তবে কাছেই | রঞ্জন আমাদের দেখেই এগিয়ে এলো | বাড়ি ছিমছাম, ড্রয়িং রুমে সুন্দর আলো লাগানো হয়েছে অনুষ্ঠান উপলক্ষে | ড্রয়িং রুমটা বেশ বড়ই | অসংখ্য ছবি, সবই রঞ্জনের স্ত্রীর ছবি, রঞ্জনের আঁকা | দুর্দান্ত আঁকে রঞ্জন, মানতেই হবে | আজকের গিফটের ফটো টাও লাগানো আছে দেওয়ালে | আমার স্ত্রী দেখেই আমায় চিমটি কাটলো, “দ্যাখো কত রোমান্টিক, এরকম স্বামী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার “, বলেই মুখ ঘুরিয়ে সব দেখতে লাগলো |
কিন্তু আসল লোক কই? যার জন্য নিমন্ত্রণ সে কোথায়? আমার স্ত্রী রঞ্জনকে জিজ্ঞেস করলো |
“ওহ হ্যাঁ, আলাপ করাতেই ভুলে গেছি | স্নেহা, এই স্নেহা, ওনারা এসে গেছেন” বলে রঞ্জন আমাদের দিকে তাকালো, বললো,”আসছে”|
“হ্যাঁ ঠিক আছে “| ছোট তিতলি ঘুরে ঘুরে সব ছবি দেখছে | আমি আমার স্ত্রী, রঞ্জন কথা বলতে লাগলাম | কিছুক্ষন পরও স্নেহা আসছে না দেখে রঞ্জন গেলো ভিতরে, আমরা সোফায় বসলাম | আমার স্ত্রী বললো, “আর কাউকে ডাকেননি? আমি ভাবলাম অনেকেই থাকবেন “| আমি বললাম,” হ্যাঁ সত্যিই আমিও অবাক হইনি, বলবো না “|
হঠাৎ রঞ্জনের গলার একটা আর্তনাদ পেলাম | আমরা চমকে উঠলাম, ছুটে ভিতরে গেলাম, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না | রঞ্জন ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে |ওর মুখটা কিরকম লাগছে, আগে এরকম দেখেনি | দেখে আমার কেমন অস্বস্তি হতে লাগলো | রঞ্জন আর্তনাদ করছে,” স্নেহা, স্নেহা কোথায় তুমি? ঠিক আছে আমি তোমায় আর বকবো না, কোথায় গেলে? ওনারা কি ভবছেন?”
“আপনার স্ত্রী আশেপাশেই হয়তো গেছে, আপনি এতটা টেনশন কেন করছেন? উনি তো জানেন আমরা আসব |” আমার স্ত্রী বললো |
রঞ্জন কিরকমই একটা করতে লাগলো,” নাহ ! চলে গেল, আবার চলে গেল | আমায় ছেড়েই তো যেতে চায় ও | কতবার বলেছি আমায় রাগিয়ে দিয়ো না, সেই চলে গেল | উফফ ! মাথাটা যন্ত্রনায় ফেটে যাচ্ছে” বলতে বলতেই রঞ্জন মাথার রগ ধরে মাটিতে বসে পড়লো | আমরা কিং কর্তব্য বিমূঢ়, এরকম কেন বিহেভ করছে ও? আর ওর স্ত্রী গেলই বা কোথায়?
রঞ্জন চিৎকার করে উঠলো,”স্নেহা” বলে,লুটিয়ে পড়ল মাটিতে |
তিতলি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেছে | আমরাও আশপাশের কাউকে তেমন চিনি না, যে ডাকবো | কিন্তু ডাকতে তো হবেই, পাশের লাগোয়া বাড়িতে গিয়ে ডাকলাম, মিঃ মিত্রকে | উনি তো আমাদের কথা শুনে এমন ভাবে তাকালেন যেন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার | ওনাকে নিয়ে এলাম | উনি ডাক্তারকে ফোন করলেন | ডাক্তারও এলো সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সও | রঞ্জনকে মানসিক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হলো |
আমাদের তখনও পুরো ঘটনাটা বিশ্বাসই হচ্ছিলো না | ডাক্তার বাবু আর মিঃ মিত্রর কাছে যা জানলাম, – ‘রঞ্জন আর ওর স্ত্রী স্নেহা অনেকদিন ধরেই এই জায়গায় থাকতো,ওদের বিয়ের পর থেকে |ওদের বাড়ি থেকে মানেনি তাই দু পক্ষর-ই বাড়ির কারও সাথে যোগাযোগ ছিল না | রঞ্জন ওর স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতো, সেটা ওর প্রতিবেশী বলেই মিঃ মিত্র ভাল জানতেন, রঞ্জনের ওর স্ত্রীর প্রতি অপার ভালোবাসার কথা | একদিন কোন কারণে স্ত্রীর সাথে তুমুল ঝগড়া লাগে রঞ্জনের |
আশপাশের বাড়ির কানেও সেটা পৌঁছায়, রঞ্জন এমনিতে খুব শান্ত স্বভাবের ছিল, কিন্তু রাগলে চণ্ডাল | কথা কাটাকাটির ফলে ও ওর সবথেকে ভালোবাসার মানুষ স্নেহাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়, হিতাহিত জ্ঞান শুন্য হয়ে, ব্যাগ-ব্যাগেজ সমেত |
স্নেহও ছিল খুব অভিমানী | মিঃ মিত্ররা ওকে রাতে থাকতে বলেছিলো কিন্তু ও শোনেনি | জেদের বশে ও ব্যাগ সমেত নিজের বাপের বাড়ির দিকে সম্ভবত চলে যায় | কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ ওই ট্রেনটি বেলাইন হয়ে বিশাল এক্সিডেন্ট হয়, স্নেহাও বাঁচেনি | তা প্রায় ৫ বছর হয়ে গেলো ঘটনার |
তারপর থেকেই এই ঘটনার জন্য রঞ্জন নিজেকেই দায়ী করে | মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, রঞ্জন বা স্নেহার বাড়ির লোক কখনোই আসেনি, এতো ঘটনার পর | খালি রঞ্জনের ভাই ছাড়া | ও ই হসপিটালে ভর্তি করে | কিন্তু ওর পক্ষেও খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না এতদিন, তাই ডাক্তার বাবু হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করতে বাধ্য হন | রুটিন ওষুধ লিখে দেয়া সত্ত্বেও রঞ্জন না নেওয়ায় আবার রোগটা চাগাড় দিয়েছে | রঞ্জনের ভাই, এরা সবাই রঞ্জনের চিকিৎসার জন্য লড়াই চালাচ্ছে , যদি সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা সম্ভব হয় | এতো ব্যয় বাহন করা এতোদিন ধরে খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে |
রঞ্জন এর আগে কয়েকবার নাকি হাসপাতাল থেকে পালিয়েও গেছে | সে এখনো এটাই মানে যে স্নেহা বেঁচে আছে | পাঁচ বছর আগের সিচুয়েশন এই বাঁচে ও এখনও |
সব শুনে মনটা কিরকম হয়ে গেল,তা অবর্ণনীয় | আমরা রঞ্জনের বাড়িটাও দেখলাম , সত্যিই বাড়িতে স্নেহার শাড়ী বা বাকি ব্যবহার্য জিনিসপত্র এমন ভাবে রঞ্জন রেখেছে যেন বাড়িতে দু’জনই থাকে |
আমরা হাসপাতালে রঞ্জনকে দেখতেও যাই, কথা বলার মতো অবস্থা ওর ছিল না | ভাগ্যের কি পরিহাস | সত্যি এখনো অবিশ্বাস্য | পুরোটাই যেন ধাঁধা এখনো আমার কাছে |
