||১||
“আর না মা, আর দিয়ো না”- বলেই ভাতের থালার উপর হাত দেখিয়ে মা কে যথাসাধ্য নিষেধ করার চেষ্টা করলো রজত |
“থাম তো সারাদিন কত খেটেছিস আর ঘুরছিস, সে কি চোখে দেখছি না? এটুকুও না খেলে কি শরীর চলবে?”- বলেই রজতের মা কমলা দেবী খানিকটা ভাত দিয়ে দিলেন একমাত্র ছেলের থালায় |
মধ্যবিত্ত আর পাঁচটা বাড়ির মতোই এ বাড়ির ছবিটা, আলাদা কিছুই নেই | রজত পাশ করে এখন আপাতত বেকার, একটা চাকরির জন্য দিনরাত লড়াই চলছে তার | এরই মধ্যে খবরের কাগজে অদ্ভুত একটা বিজ্ঞাপন চোখে পড়ায় আজ সেখানেই যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো | বড় লোকের খামখেয়ালীপনা যাকে বলে আর কি | ” রোজ দু ঘন্টা করে গল্প বলতে হবে “, ঠিকই বলছি ,এটাই বিজ্ঞাপনটার আসল কথা |
তা এরকম প্রস্তাব কেই বা হাতছাড়া করবে? তাই খেয়েদেয়ে ট্রামে চেপে বসলো রজত | জায়গাটা কলেজ স্ট্রিট এলাকায়, তাই ওর বাড়ির থেকে ট্রামটাই সুবিধের |
*******************
আধঘন্টার মধ্যে গন্তব্যে পৌছালো রজত, এ যে বিশাল ব্যাপার | বাড়িখানা দেখেই তাক লেগে যায় | যদি এই টিউশনি থুড়ি গল্প বলার কাজটা জোটে মন্দ হয় না কিন্তু আমদানিটা | এই ভেবেই আনন্দে উদ্বেলিত হলো রজত |
||২||
পুরানো আমলের বাড়ি | প্রতিটি আনাচ কানাচ সেই ঐতিহ্য বহন করছে | ভিতরের দিকের ঘেরা বারান্দা, বড় বড় থাম, দাবার ছকের মেঝে, উঁচু উঁচু সিলিং কড়ি কাঠ দেওয়া | বড় বড় জানালা খড়খড়ি দেওয়া | সব মিলিয়ে সেই পুরানো দিনের আমেজটা সারা বাড়িকে ঘিরে রেখেছে | নিজের পরিচয় দিতে একজন নিয়ে গেলো দালান পেরিয়ে বসার ঘরে | আশ্চর্যজনক ভাবে ও একাই এসেছে, কারণ আরও কাওকে ওর মতন এক্সপেক্ট করেছিল | কিন্তু ঘর ফাঁকাই |
‘ভালোই হয়েছে’ এই ভেবে নরম গদিতে গা এলিয়ে বসে এদিক ওদিক দেখতে লাগলো রজত , ফোনটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে | কিছুক্ষন পর বাইরে পায়ের শব্দ পেয়ে সোজা হয়ে বসলো রজত | ‘নমস্কার’ বলে সৌজন্য বিনিময়ের শেষে সামনা সামনি বসলেন ভদ্রলোক | চেহারা আর ব্যক্তিত্বে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট | রজতকে সুযোগ না দিয়ে ভদ্রলোকই শুরু করলেন,”আমার নাম প্রনবেশ রায়, আমার মেয়ে নীহারিকা রায় যার জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া আর আপনার আসা |”
“আচ্ছা”, বলে রজত মনে মনে ভাবলো, ‘ভদ্রলোকের বয়স তো কম হয়নি, তবে এই বয়সে ঐটুকু মেয়ে !’
রজতের ভাবনার রেশ টেনেই ভদ্রলোক বললেন,”আমার মেয়ের বয়স ১৮, আমার একমাত্র মেয়ে | ওকেই পড়াতে হবে |”
রজত এত বড় স্টুডেন্ট আশা করেনি, আর বিজ্ঞাপনে কিছু স্পষ্ট করে লেখাও ছিল না, তাই বললো,” কি পড়াতে হবে যদি একটু বলেন…?”
“আরে না না, সেরকম না | আপনাকে ওকে গল্প পড়ে শোনাতে হবে | মোটের উপর ওর সাথে একটু গল্প গুজব করে ওকে খুশি রাখতে হবে | আমি দু’ ঘন্টারই আবদার করছি | তার থেকে বেশি যদি পারেন, তাহলেও তার উপযুক্ত অর্থ আমি দেব |”- মিস্টার রায় |
সবটা শুনে রজত অবাক হবে না আনন্দে নাচবে খুঁজেই পেলো না | এতো বড় মেয়ে,গল্প শোনাতে হবে , কিছুতেই বুঝতে পারছিলো না রজত | ভদ্রলোক বললেন,” আপনি আসুন আমার সাথে “| বলে রজতকে নিয়ে উনি চললেন | বিশাল দালান পেরিয়ে অপর প্রান্তে বিশাল ঘরের সামনে এসে থামলেন | ঘরের সিলিং থেকে ঝুলছে ঝাড়বাতি | সারা ঘরময় ছড়ানো ছেটানো দামি আসবাব, পুতুল, বহুমূল্য সামগ্রী | ঘরে ঢুকেই ভদ্রলোক ডাকলেন,”আমার হিরু মা কই?”| এতক্ষন ধরে খেয়ালই করেনি রজত, জানলার গারদ ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এক মেয়ে | ভদ্রলোকের ডাকে অষ্টাদশী কন্যা এদিকে ফিরে তাকালো | রজত দেখলো মেয়েটি অষ্টাদশী হলেও তার চাল চলন, কথা বলার কায়দা সবকিছুই একটা ছোট বাচ্চার মতো | খিলখিলিয়ে হাসছে, বাচ্চার মতো কথা বলছে | এখন একটু একটু করে রজতের কাছে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হচ্ছিলো|
ভদ্রলোক রজতের ছাত্রীর সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন | রজত হেসে “হ্যালো” বললো | প্রথমে একটু লজ্জা পেলেও পরে নীহারিকা, মানে হিরু মিষ্টি করে হেসে তার প্রত্যুত্তর দিলো |
কথার শেষে রজত আর ভদ্রলোক ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন |
“বুঝলেন তো “, এই হলো আমার মেয়ে | ওর মা মারা যাওয়ার আগে কোনো অসুবিধা ছিল না | কিন্তু মাস তিনেক আগে আমার স্ত্রী মারা যাওয়ায় ওকে সামলানো খুব মুশকিল হয়ে গেছে |ওর সাথে সময় যে কাটাবো তারও উপায় নেই ব্যবসার কাজের যা চাপ | আর আমার ছেলে যে নেহাতই ছোট | আমার বড় দাদা আর ছোট ভাই আর তাদের স্ত্রীরাই দেখে | কিন্তু হিরুর একটু যত্নের আর সময়ের প্রয়োজন | ওর সাথে গল্প করার লোক ওর মা-ই ছিল | এখন বড় একা | এবার সমস্ত দিক বিবেচনা করে আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে ফোন করে জানিয়ে দেবেন | রজত নমস্কার জানিয়ে বাড়ি ফিরলো |
||৩||
বাড়ি ফেরার পর থেকেই রজতের মন টা অন্যরকম হয়ে গেল | এরকম কিছু যেহেতু ও আশা করেনি তাই মনে লেগে থাকাটাই স্বাভাবিক | কারও অর্থ নেই কিন্তু শান্তি আছে আবার কারও বিপুল অর্থ কিন্তু মনে শান্তি নেই |
কতটুকুই বা বয়স মেয়েটার, রজতের থেকে বছর তিনেকের ছোট হবে | এই বয়সে মাকে হারানোর শোক চাট্টিখানি কথা নয় | তখন এত ভালো ভাবে দেখেনি | এখন ভাবতে বসলো রজত | মেয়েটার মুখটা কেমন অদ্ভুত মায়া জড়ানো, অনাবিল সারল্য | অনেক ভেবে রজত মিঃ রায় কে ফোন করে “হ্যাঁ” বলে দিলো |
||৪||
শুরু হলো রজতের একদম অন্যরকম এক অনুভূতি পাওয়ার পালা | হিরুর সারল্য, আধোআধো কথাবার্তা, অদ্ভুত কাজকর্ম | এসব কিছুতেই রাগের থেকে হাসি পেত বেশি | রাগ করতে চাইলেও যেন রাগ করা যায় না, এমনই এই ‘হিরু’ | বাড়ি ফিরে নিজে নিজে বসে নিজেই ভাবে আর হাসে |
হিরু প্রায়ই রজতের কাছে চকলেট -এর বায়না করে | বাড়িতে যেন না জানে এই শমনও জারি থাকে | রজতও লুকিয়ে লুকিয়ে দেয় | হিরু সারামুখে চকলেট মাখিয়ে যখন খায়, তখন ওর শিশুসুলভ আচরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে রজত | রজত এখন দু’ঘন্টার থেকে খানিকটা বেশিই থাকে ওর সাথে | ওই সময়টা দারুন উপভোগ করে রজত | হিরুর সাথে সাথে নিজেও যেন শৈশবে ফিরে যায় |
হিরু তো এখন রজতকে ছাড়তেই চায় না | ওকে গল্প শোনাতে হবে, চকলেট খাওয়াতে হবে,গল্প করতে হবে এমনই কত আবদার তার |
এভাবেই দিন এগোতে লাগলো আর হিরু আর রজত-এর বন্ধুত্ব গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে লাগলো |
||৫||
আজ রজত হিরুর জন্য কড়াইশুঁটির কচুরি আলুরদম নিয়ে এসেছে, হিরুর আব্দারেই | তা সেই আলুরদম সমেত কচুরি মুখে পুরতেই তেলে ঝোলে একাক্কার করলো | রজত হিরুর ঠোঁটের উপর ঝোলটা হাত দিয়ে মুছিয়ে দিলো | হিরু খপ করে হাতটা ধরলো রজতের |
“কি হলো আবার?” রজত |
“খাইয়ে দাও আমায়” শিশু সুলভ কণ্ঠস্বরে রজতের হাত ধরে আবদার করলো হিরু |
সেই আবদার, সেই চাহনি, এসবে কি ছিল জানে না রজত, কিন্তু, যেন অন্যরকম একটা অনুভূতি হলো রজতের, যা আগে কখনো হয়নি | রজত হিরুকে হাতে করে খাইয়ে দিতে লাগলো, হিরুও তৃপ্তি করে খেতে লাগলো |
**********************
বাড়ি ফিরে আজ বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে রজতের | কোনোদিন এভাবে ভাবেনি, কিন্তু আজ ভাবনা গুলো এসেই যাচ্ছে | অসুস্থতার পর্দার পিছনের মেয়েটি আজ ভাবাচ্ছে রজতকে – যে হিরু সম্পূর্ণ সুস্থ, স্বাভাবিক, আর পাঁচটা মেয়ের মতো, যার ঘন চুল, দীর্ঘ চোখ, সুন্দর মুখের হাসি, মায়াময়ী চাহনি এসব কিছু মিলিয়ে অসামান্যা সে | যাকে রজত এতদিন দেখেইনি, পর্দার বাইরের হিরুকে দেখতেই অভ্যস্ত,বলা ভালো ব্যস্ত ছিল রজত | সে পর্দার ওপাশে লুকোনো রূপসীকে কোনোদিন খেয়ালই করেনি | যার শুধু মুখই রূপে মোহময়ী না, তার স্বচ্ছ মনটাও মুখের মতোই সুন্দর | সেখানে শুধু ভালোবাসা আছে, ব্যস,কোনো পাঁক যাকে এখনো স্পর্শই করতে পারেনি |
**********************
আজ হিরু তার প্রিয় চাউমিন খেতে ব্যস্ত | খেতে খেতে অর্ধেক খাচ্ছে অর্ধেক ফেলছে | রজত ইচ্ছে করেই খাইয়ে দেয়নি | ওকে তো নিজেরটা নিজেকে শিখে নিতে হবে | রজত তো আর সারাজীবন এভাবে ওকে সাহায্য করার জন্য থাকবে না | বাস্তবতার মাটি টা বড় শক্ত, কঠিন জেনে ছুঁতে ইচ্ছে করে না সে মাটিকে | রজত বাধ্য হয়ে হিরুর অবস্থা দেখে বললো,” হিরু একটু ঠিক করে খাওয়ার চেষ্টা কর, চামচটা ঠিক করে ধরতে শেখ | আমি যখন থাকবো না তোমায় নিজেকেই তো সব করতে হবে |”
ওকে অবাক করে দিয়ে হিরু বললো তার স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে,” তুমি আবার কোথায় যাবে? তুমি যেখানে যাবে আমায়ও নিয়ে যাবে, ব্যস, আবার কি?” বলে মনের সুখে নুডলস নিয়ে খেলতে খেলতে খেতে লাগলো | রজত কিছু বলতে পারলো না, জাস্ট কিচ্ছু না | চুপ করে রইলো | শুধু ওর মনে চলতে লাগলো অন্তর্দ্বন্দ্ব, যা কাউকে বলাও অসম্ভব, বোঝানোও |
এখন অনেক চেষ্টা করেও সে কিছুতেই হিরুকে বাড়ি ফেরার পরও মন থেকে সরাতে পারে না | বলা ভালো, সরাতে চায় না | যেন সারা দিনরাত হিরুর সাথে থাকলেই ভালো হয় | ওকে দেখতেই রজতের সবথেকে ভালো লাগে | অনন্ত সময় ধরে | কেন এমন হচ্ছে রজত নিজেও জানে না |
||৬||
এসবের মধ্যেই রজত অবশেষে একটা ভালো চাকরি পেলো | চাকরির সূত্রে চলে যেতে হবে গুজরাট | মানে, হিরুর সাথে দেখা আর হবে না, ভেবেই চাকরি পাওয়ার খুশিটা কেমন ম্লান হয়ে গেল | এ কি হচ্ছে রজতের সাথে? এটা তো অসম্ভব, এর তো কোনো পরিণতি নেই | তাও কেন? মন কি এসব বোঝে? নাহ, বুঝলে রজত কি এসব ভাবতো?
***************************
আজ সময়ের খানিক আগেই পৌঁছে গেল মিঃ রায়ের বাড়ি | হিরুর ঘরে ঢুকতেই রজত দেখলো ও পিছন ঘুরে বসে ছবি আঁকছে একটা বর-বউ এর | সেখানে লেখা-‘ আমি আর স্যার’ , দেখেই আঁতকে উঠলো রজত | রজতকে দেখে হিরু যেন একটু লজ্জাই পেলো | কিছুক্ষন পর সলজ্জে আঁকা ছবিটা রজতের হাতে দিয়ে বললো,” তুমি বর আর আমি বউ, হি হি |”
কিছু বলতে পারলো না রজত | শুধু বুঝলো একটা নামহীন,পরিণতিহীন, একদম অন্যরকম এক ভালোবাসায় বাঁধা পড়ছে শুধু সে না, হিরুও | সেদিন অনেক গল্পের শেষে রজত হিরুকে বললো,” আমি চলে যাচ্ছি, চাকরি পেয়েছি তো | তুমি কিন্তু লক্ষী মেয়ের মতো থাকবে, কেমন?”
শুনে এক লহমায় হিরুর সরল হাসিটা মিলিয়ে গেল মুখ থেকে | চোখটা জলে ভরে গেল হিরুর | রজতের খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু হিরুর সামনে কাঁদতে পারছে কই? মনে হচ্ছে কেঁদে একটু হালকা হয় | কিন্তু ছেলেদের তো একমাত্র লুকিয়ে কাঁদবারই অনুমতি আছে |
রজত হিরুকে সামলাবে নাকি নিজেকে? রজত হিরুর বাবার সাথে কথা বলে বেরিয়ে এল |
অসম্ভব একটা যন্ত্রনা হচ্ছে আজ রজতের যেটা মুখে বলে বোঝানো অসম্ভব | আর বললেই বা কাকে বলবে? কি বলবে? কবে হিরু ওর এতো কাছের এতো আপন হয়ে গেছে, রজত নিজেও বোঝেনি | রজতেরই এতো কষ্ট হচ্ছে তাহলে হিরুর কত কষ্ট হচ্ছে? ও যে বড় অসহায়, রজতকে আঁকড়েই হাসছিলো মেয়েটা, সেই হাসিটাও কেড়ে নিয়ে রজত অপরাধী ছাড়া আজ আর কি?
||৭||
“হ্যাঁ মা নিজের খেয়াল রাখবো, তোমরা সাবধানে থাকবে”- ট্রেন ছাড়তেই মা বাবাকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে নিজের সিটে বসলো রজত | ট্রেন গতি বাড়িয়ে ছুটতে লাগলো | রজত চকচকে রেললাইনটার দিকে তাকিয়ে হাঁ করে ছিল |
কে জানে হিরুটা কেমন আছে | ও ভালো আছে তো? আবারও রজত হিরুর ভাবনায় ভাবিত হচ্ছে প্রতিবারের মতো | সে নিজের মনের সাথে লড়াই করে বড় ক্লান্ত | কার কথা শুনবে রজত? মাথার নাকি মনের? একবার ট্রেনের চেনটার দিকে তাকালো, একবার সুদূর প্রসারিত রেললাইন টার দিকে | ট্রেন তখন দ্রুত গতিতে ছুটছে সব ছাড়িয়ে |
** ** **

